রবীন্দ্রনাথের গানের শব্দ পরিবর্তন করবার কি আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে? এই ধরণের প্রচেষ্টা কোনোদিনই রবীন্দ্রনাথের অনুমোদন পায় নি। তাঁর গানের কথা বা সুরের উপরে কোনো রকম হস্তক্ষেপ রবীন্দ্রনাথ কখনোই সহ্য করতে পারতেন না।
তাঁর বিপুল সৃষ্টিসম্ভারের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় ছিল তাঁর গানগুলি। তাদের তিনি লালন করেছেন সন্তানস্নেহে। ছিল প্রচ্ছন্ন অহংকারও। একবার দিলীপকুমার রায় ‘তোমার বীণা আমার মনোমাঝে’ গানটিতে নিজেই সুরারোপ করতে চাইলে রবীন্দ্রনাথ ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি কি বলতে চাও আমার গান যার যেমন ইচ্ছা সে তেমনই ভাবে গাইবে? আমি তো নিজের রচনাকে সেরকম ভাবে খণ্ডবিখণ্ড করতে অনুমতি দেই নি। যে রূপ সৃষ্টিতে বাইরের লোকের হাত চালাবার পথ আছে তার এক নিয়ম, যার পথ নেই তার অন্য নিয়ম। – আমার গানে আমি তো সেরকম ফাঁক রাখি নি যে, সেটা অপরে ভরিয়ে দেওয়াতে আমি কৃতজ্ঞ হয়ে উঠব।’ অর্থাৎ তিনি স্পষ্টভাবে বলে গিয়েছেন যে তাঁর রচনায় অন্য লোকের ‘হাত চালাবার’ কোনো অধিকার নেই।
রবীন্দ্রসঙ্গীতের আসল সম্পদ তার কথা, তার নিখুঁত শব্দচয়ন। তাই গানের প্রতিটি বাণীই প্রাণকে স্পর্শ করে যায়, গভীর উপলব্ধিতে চেতনা ঋদ্ধ হয়। রবীন্দ্রনাথের প্রত্যেকটি গানের অন্তরালে রয়েছে তার সুনির্দিষ্ট কথা, সুরের চয়ন এবং বয়ন-কাহিনী। গানের কথাতেই উন্মোচিত হয় কবিমনের মানসপট, অন্তর্লোকের ভাব-কল্পজগত, বাহ্যিক ঘটনাক্রম আর অবচেতনার অভিঘাত। তাই গভীর অনুভূতি আর মনন থেকে রচিত রবীন্দ্রনাথের গানের প্রতিটি বাক্য শাশ্বত এবং কালোত্তীর্ণ। সেই বাক্যকে সামান্যতম বদল করবার প্রচেষ্টা রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে আঘাত হানবার স্পর্ধিত অহংকার।
১৯৪০ সালে জোড়াসাঁকোর বিচিত্রা ভবনের এক অনুষ্ঠানে গভীর বেদনায় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘আমার গান যাতে আমার গান বলে মনে হয় এইটি তোমরা কোরো। আরো হাজারো গান হয়ত আছে, তাদের মাটি করে দাও-না, আমার দুঃখ নেই। এখন এমন হয় যে, আমার গান শুনে নিজের গান কিনা বুঝতে পারি না। নিজে রচনা করলুম, পরের মুখে নষ্ট হচ্ছে, এ যেন অসহ্য।’
রবীন্দ্রনাথ যখন নিজেই তাঁর গানের কথা বা সুরকে পরিবর্তন করবার অনুমতি দেন নি, বরং বারবার আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন, তখন কেন এই ‘খোদার উপর খোদকারি’র চেষ্টা?




