বেশ্যাদ্বারের মাটি
শীত বাড়ছে। বাজার হাট সেই কখন ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। তাও বসে থাকে ল্যাংড়া পাঁচু। বেশ কয়েকটা কানা বেগুন আর কোরণ্ডে পটল পড়ে আছে এখনো, এই ক’টা না বেচে যেতে পারবেনা পাঁচু। সব বেচতে না পারলে পরদিন থেকে মহাজন আর তাকে দোকানে রাখবে না৷
নিজের ছেঁড়া চাদরটা জড়িয়ে গলা চড়াল এই আড়াইশো কুড়ি… কিলো ষাট…
আর অমনি হাসির রোল উঠল পাশ থেকে। ট্যারা কথা ভেসে এলো… ওরে চেহারাটা চকচকে কর না হলে কি আর বিক্রি হবে। লোকে দেখবে তারপর তো খাবে। মনেমনে গাল পাড়ে পাঁচু , …. ণ্ডী…. গী…
আজ যত বাড়ে মফস্বলে ট্রেনের প্যাসেঞ্জার কমে আসে আর স্টেশনের পাশে এর ছোট্ট লাল বস্তি তার মেয়েরা বাইরে বেরিয়ে আসে সেজেগুজে এসে দাঁড়ায় পথের দু’ধারে। যতক্ষণ না খদ্দের জোটে ওদের শীত রাতের মশকরা পাঁচু…
—এ পাঁচু… তোর পা’র মতো ওইটাও সরু?
হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে অশ্রাব্য ভাষা বলে চেঁচিয়ে ওঠে পাঁচু। এই এদের কারুর জন্যই তার এই হাল। এদেরই কারোর থেকে সে হয়েছে। নাহলে, বাজারের ডাস্টবিনে তাকে ফেলে দিয়েছিল কেন? একটা ভালো ঘর পরিবার পেলে পড়াশোনা করতে পারত… তা নয় এই বয়সে মহাজনের মজুর খাটো… আর শালা মিনসে মহাজন বিকেল গড়ালেই পালিয়ে যায়। বাকি মাল নিয়ে এখন তুমি হিমশিম খাও। পেট আর ছাদের জন্য সেটুকুই করতে হয়। তমোঘ্ন
দোকানের তাকে মা দুর্গার ছবির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে, ” মা, তুলে নাও না। আর ভালো লাগে না। একটা নতুন জীবন দিও। নতুন করে শুরু করব। এই জীবনে আর টানতে পারি না। ”
মা দুর্গা কিছুই বলেন না। একইরকম হাসিহাসি মুখ করে এই ফটো থেকে তাকিয়েই থাকেন। মাঝে মাঝে পাঁচুর মনে হয়, মাও বুঝি তাকে ব্যঙ্গ করেন।
***
দিন যায়। শীত বাড়ে। খবরে শৈত্য প্রবাহের আগাম সূচনা দেওয়া হয়। কিন্তু পাঁচুর কিছু পরিবর্তন হয় না। তার সেই ছেঁড়া চাদরের তলায় আরেকটা গরম জমা বাড়ে না।
সেইদিন তুমুল শীত। বিকাল গড়াতেই পাঁচু টের পেল নাকের সোঁসাগুলো জ্বালা করছে। গলায় ঢোক গেলা যায় না। তবুও বসে থাকে। ভাঙা গলা চড়িয়ে হাঁকে…আড়াইশো কুড়ি… কিলো ষাট…
সময় গড়ায় শরীরের ভেতর তাপের চলন অনুভব করে পাঁচু। জ্বর আসছে বোধহয়। এক ঘন্টা পর আর পারে না পাঁচু উঠে দাঁড়ায়। মোড়ের মাথা থেকে ওষুধ আনতে হবে৷
ক্র্যাচ বগলে নেয়। রাস্তার মাঝামাঝি এসে বাইকের আলোটা চোখে পড়তেই চোখটা দাঁড়িয়ে গেল তার। টলে উঠল মাথাটা… আর কিছু মনে নাই। তমোঘ্ন
***
জ্ঞান যখন ফিরল, দরদর করে ঘাম দিচ্ছে। একখানা ঘুপছি ঘরে সে শুয়ে আছে। ঘরটার ভিতরে সিগারেট, মদ আর সুগন্ধি মিলে বিকট এক গন্ধ। চারিদিকে টিমটিম করছে লাল-নীল টুনি। সেই টুনির আলোতেই দেখলো তাকে…
ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। মুখে ভয় আর অপ্রস্তুতের ভাব স্পষ্ট।
তাকে দেখে এগিয়ে এল মেয়েটা। ম্লান হাসল। ভয় নেই ছুঁইনি, তোর জাত যায়নি।
কথার মাঝেই দরজায় কড়া নাড়ল কেউ, মুহূর্তে মেজাজ চড়িয়ে মেয়েটা অশ্রাব্য খিস্তি দিল তাকে…
তাড়াতাড়ি উঠে পড়তে যাচ্ছিল পাঁচু। তোমার ব্যবসার ক্ষতি করলাম। তোমার খরিদ্দার আসছে। তমোঘ্ন
আবার ম্লান হাসো মেয়েটা, “ হ্যাঁ, শেষ রাতের শেষ খদ্দের। আর আসবে না। এতক্ষণ যারা এসেছে সবকটাকে ভাগিয়েছি। কী করব? তুমি ছিলে যে….
তুমি কতক্ষণ ঘুমিয়েছো নিজেই জানো না। এখন সাড়ে তিনটে বাজে। এই মাঝরাতে তোমাকে তোমার মালিক দরজা খুলে দেবে না বরং রাতটুকু এখানে থেকে যাও। ঠান্ডা লাগবে না। ভোরের আলো ফোটার আগে বেরিয়ে যেও। আর হ্যাঁ এই চাদরটা নিয়ে যেও।
আমার ব্যবহার করা হয়নি ভাই, এন জি ও-র দিদিরা দিয়ে গেছে পরশু। ”
মেয়েটি যেমন এসেছিল তেমন বেরিয়ে যায়। পাঁচু এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখতে থাকে ঘরটা। চোখ আটকে যায়, দেওয়ালের ওপরে একেবারে ডানদিকে আটকানো ছবিটায়, মা দুর্গার ছবি। মা দুর্গা এখনো একইভাবে হাসছে… টুনি বালবের ঝকমকিতে কখনো লাল, কখনো নীল, কখনও সবুজ কিন্তু হাসি বদলাচ্ছে না।
পাঁচুর মনে পড়ে, কে যেন বলেছিল, দুর্গা ঠাকুরের মূর্তি গড়তে বেশ্যাবাড়ির মাটি লাগে




