শীতের মরশুমে জমজমাট — অতীনপুরের রাতকথা
ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি একটি রাত। শেষ ট্রেন মিস করে গল্পের নায়ক সারস্বত স্টেশনেই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেয়। স্টেশনের নাম অতীনপুর। প্রত্যন্ত গ্রামের অনামী এক ছোটো স্টেশন। গ্রামের নামেই স্টেশনের নাম অতীনপুর। যদিও ভালো নাম অতীন্দ্রপুর। স্থানীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী স্বর্গত অতীন্দ্র চন্দ্র মল্লিকের নামে এই স্টেশন ও গ্রামের নাম হয় অতীন্দ্রপুর। লোকমুখে ছোটো করে অতীনপুর।
যা হোক, ফেব্রুয়ারি মাসের কমে আসা শীতেও দেখা যায় মাফলারে ঈষৎ মুখ ঢেকে থাকতে সারস্বত অপেক্ষা করতে থাকে ভোরের আলোর। অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো বিকল্পই থাকে না তার। কারণ, জনবসতি স্টেশন থেকে অনেক দূরে আর আশেপাশে নেই কোনো রাত্রি যাপনের জন্য হোটেল। অগত্যা স্টেশনেই রাত কাটানোর জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে একটা সিগারেট ধরাতে গিয়ে সে তার দেশলাইটা খুঁজতে থাকে। ঠিক সেই সময় একটা লাইটার জ্বালিয়ে সিগারেটের মুখে ধরে এক রহস্যময়ী। কথায় কথায় জানা যায় তার নাম কামিনীর। কে এই কামিনী? এত রাতে এই নির্জন স্টেশনে কীই-বা করছে সে একা? বাক্যালাপে এগিয়ে চলে গল্প। উঠে আসে ফেলে আসা কুড়ি বছর আগের কোনো এক অতীতের স্মৃতি। ক্রমশই ঘণীভূত হতে থাকে রহস্য। জানা যায় রাতের অন্ধকারে এই অতীনপুর আসলে একটি পাপ-পুরী, তার একচ্ছত্র অধিপতি অতীনপুরের মুকুটহীন সম্রাট নাটকের মুখ্য খলনায়ক সুভাষ চাকলাদার। সত্যিই কি ভোরের আলো মুছে দেবে এই অতীনপুরের পাপের অন্ধকার? ক্রমেই জমে ওঠে গল্প আর অপ্রত্যাশিতভাবে আসতে থকে একের পর এক চমক, আর তারপর…?
দর্শকদের ভাবনার খোরাক জুগিয়ে শেষ হয়েও মনের কোণে একটা রেশ রেখে শেষ হয় গল্পটি।
নির্ভেজাল বিনোদনের মোড়কে উত্তেজনায় টানটান এক রোমাঞ্চকর নাট্য “অতীনপুরের রাতকথা”। বাগুইআটি সহজিয়া নাট্যসংস্থা’র প্রযোজনায় এই নাটকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় মঞ্চায়ন হয়ে গেল গত ১২ জানুয়ারি ২০২৩ উত্তর কলকাতার মিনার্ভা থিয়েটারে এবং গত ১৫ জানুয়ারি ২০২৩ নৈহাটির ঐকতান মঞ্চে। এই শীতের মরশুমে জমজমাট “অতীনপুরের রাতকথা”।
নাট্যকার ও পরিচালক শ্রী প্রশান্ত সেনের মুন্সিয়ানায় মঞ্চের এই নাট্য যেন হয়ে ওঠে জীবন্ত সিনেমা।
এই নাটকের মূখ্য চরিত্র সারস্বত মল্লিকের ভূমিকায় স্বয়ং নাটককার তথা পরিচালক শ্রী প্রশান্ত সেনের অনায়াস অভিনয় এবং কামিনীর ভূমিকায় মহুয়া সরকার বেশ সাবলীল উপস্হাপনা মন্ত্রমুগ্ধের মতো এক ঘন্টা সম্মোহিত করে রাখে দর্শকদের। সুভাষ চাকলাদারের ভূমিকায় তন্ময় মন্ডলের খল চরিত্রে অভিনয় উপভোগ্য । মালতীর ভূমিকায় তনিমা মুখার্জী ও রেলপুলিশ মদন মাকালের ভূমিকায় জগন্নাথ ঘোষের যুগ্মকৌতুক অভিনয় উপস্থিত দর্শকদের অনাবিল আনন্দ দান করে। উন্মাদিনী/অরুণা দত্ত চরিত্রে রিঙ্কি দাসের অভিনয়ও প্রশংসনীয়। এছাড়া এই নাটকের অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন রবীন চক্রবর্তী (পঞ্চায়েত প্রধান), রিণি বোস (সারস্বতের মা), অপূর্ব খাঁড়া (তরুণ সারস্বত), সোমা সাহা (মণীষা মণ্ডল)। দুটি খল চরিত্রে যথাক্রমে কৌশিক তালুকদার ও সুদান হালদারে্য জুটিও জমজমাট। এছাড়া অন্যান্য চরিত্রে যথাযথ অভিনয় করেছেন রেণু দাস, অঙ্কিতা দে ও কোমল দাস।
এই নাটকে ব্যবহৃত নাট্যকার-নির্দেশক শ্রী প্রশান্ত সেন রচিত দুটি মৌলিক গানে সুর দিয়েছেন অর্ণিশা সেন। গান দুটি গেয়েছে কৃত্তিকা বোস, তনিমা মুখার্জী ও জ্যোতিষ্ক চ্যাটার্জী। আলোক নির্মান ও প্রক্ষেপণে সুবল কর্মকার এবং আবহ পরিকল্পনা ও প্রয়োগে অর্ণিশা সেন যথেষ্ট প্রশংসনীয়। সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও প্রপস্ ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে ছিলেন রেণু দাস ও প্রত্যুষা সেন। নির্দেশকের মঞ্চ ভাবনায় এই নাটকের মঞ্চ সজ্জা ও নির্মাণে মদন হালদার ও সুদান হালদার।
নাটকের শেষে নির্দেশক প্রশান্ত সেন বলেন, বেশ কিছু অভিজ্ঞ শিল্পীদের সাথে বহু নতুন শিল্পী কাজ করেছে এই নাটকে। সমগ্র শিল্পীদের নিরলস পরিশ্রম ও সততার সঙ্গে কাজ করার অদম্য আগ্রহ এই প্রযোজনাটির সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।




