HomeUncategorizedWinter Sesion : শীতের সকালে ঘুরে আসুন পাঁচশত বছর পূর্বের বাংলার বৃন্দাবন...

Winter Sesion : শীতের সকালে ঘুরে আসুন পাঁচশত বছর পূর্বের বাংলার বৃন্দাবন ‘বাওয়ালি’ থেকে।

spot_img
- Advertisement -

Winter Sesion : পাঁচশত বছর পূর্বে কলকাতার খুব কাছে কৃষ্ণ নগরী বাংলার বৃন্দাবন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছিল এই ‘বাওয়ালি’ গ্রাম। আজ আলোচনা করছি এই মন্দির নগরী বাওয়ালীর ইতিহাস, শিল্প, সাহিত্যের ইতিকথা নিয়ে। ইতিহাস ও সাবেকিয়ানায় যদি আমরা আজ থেকে ৫০০ বছর পূর্বে ফিরে যাই তখন বাংলায় ছিল ছোটো-বড়ো জমিদারি শাসন। বর্তমান দক্ষিণ ২৪ পরগনা, কলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চল সেই সময় ছিল জঙ্গলাকীর্ণ সুন্দরবনের অন্তর্ভুক্ত। সেইসময় ডাকাত, ঠগীরাই মানুষের ওপর অত্যাচার, জুলুম করত। এরা একবার মুঘল সম্রাটের বিরুদ্ধেও তীব্র বিদ্রোহ করেছিল, সেই সময় উত্তরপ্রদেশের মুঘল সেনাধক্ষ্য শোভারাম রাই এই বিদ্রোহ দমন করেছিলেন।

এতে মুঘল সম্রাট আকবর খুশি হয়ে তাকে বাংলার তিন লক্ষ একর জমি প্রদান করে জায়গীরদার নিযুক্ত করেন। শোভারামের বংশধরেরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বর্তমান বাওয়ালীতে তাদের জমিদারী প্রতিষ্ঠা করেন এবং মন্ডল জমিদার হিসেবে পরিচিত হন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সখ্যতা বজায় রেখে এই জমিদাররা প্রভূত সম্পদ লাভ করেন। কোম্পানী থেকে তারা ‘রাজা’ উপাধি গ্রহণ করেন। বিচারবুদ্ধি ও পরিচালনার ক্ষেত্রে এই মন্ডল পরিবার এতটাই দক্ষ ছিলেন যে অল্পদিনেই তাদের জমিদারির ব্যাপ্তি হয়েছিল টালিগঞ্জ, বজবজ, তারাতলা, বেহালা, আমতলা, বাখরাহাট, আচিপুর ইত্যাদি অঞ্চলে। শিল্প-সাহিত্য এবং আভিজাত্যের দিক দিয়ে এই জমিদাররা নজির সৃষ্টি করেছিলেন। তাদের রাজপ্রাসাদ থেকে মন্দির শিল্পের সর্বত্রই নান্দনিক শিল্পকলার পরিচয় পাওয়া যায়।

সেই সময় দক্ষিণবঙ্গের এই সুন্দরবন অঞ্চলটিতে সাধারণত বাউল জাতি এবং মৎস্য জাতিরা বসবাস করতেন। এখানকার উপাস্য দেবতা ছিলেন প্রধানত ‘বনবিবি’, ‘দক্ষিণরায়’, ‘মনসা’ প্রভৃতি দেবদেবী কেন্দ্রিক। বাওয়াল রাজপরিবার প্রথমদিকে শৈব ছিলেন। তারা তাদের জমিদারিতে ছোটো-বড়ো বেশ কয়েকটি নান্দনিক শিব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

Winter Sesion : শীতের সকালে ঘুরে আসুন পাঁচশত বছর পূর্বের বাংলার বৃন্দাবন ‘বাওয়ালি’ থেকে।

পরবর্তীকালে তারা বৈষ্ণবধর্মে অনুপ্রাণিত হন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভাবধারায় তারা একখণ্ড বৃন্দাবনকে এই বাওয়াল জমিদারিতে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা করেন। প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে একের পরে এক অপূর্ব শিল্পকলার নিদর্শন স্বরূপ শ্রীকৃষ্ণের মন্দির। এই মন্দির গুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ১৭৭১ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ‘রাধাকান্ত জিউ মন্দির’; ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ‘গোপীনাথ জিউ মন্দির’; ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ‘শ্যামসুন্দর জিউ মন্দির’; ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ‘রাধাবল্লভ জিউ মন্দির’; ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ‘শ্রীধর জিউ মন্দির’। এরপর একে একে তৈরি হয় ‘মদনমোহন জিউ মন্দির’, ‘লক্ষ্মী জনার্দন মন্দির’, পুরীর জগন্নাথদেবের অনুরূপ ‘জগন্নাথ-বলরাম মন্দির’, ‘রাসবিহারী গোবিন্দ মন্দির’, ‘গোপাল জিউর মন্দির’, ‘ললিতাসুন্দরীর মন্দির’, ‘রাজরাজেশ্বর মন্দির’।

এছাড়া অসংখ্য দোল মঞ্চ, রাস মঞ্চ, তুলসী মঞ্চ নির্মাণ করে দক্ষিণ ২৪ পরগনা সেই সময়ে পরিণত হয় একখন্ড বাংলার বৃন্দাবন রূপে। এই মন্দিরগুলিতে শিল্প স্থাপত্য এতটাই উন্নত ছিল যে এখানে নবরত্নের মত মন্দির নির্মিত হয়েছে। নগ্ন নারীর পরী মূর্তিও এই মন্দির স্থাপত্যে স্থান পেয়েছে। বাওয়ালীর গোপীনাথ জিউর নবরত্ন মন্দিরটি দঃ ২৪ পরগণার সর্বোচ্চ নবরত্ন মন্দিররূপে স্বীকৃত। রানী রাসমণি এই বাওয়ালীতে এসে গোপীনাথ জিউর মন্দির দর্শন করেন এবং এতটাই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন যে পরবর্তীকালে সম্পূর্ণ এই মন্দিরের অনুরূপ ভবতারিণী মন্দির, দক্ষিণেশ্বর প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সময় বৃন্দাবনের রথযাত্রার মতো বাওয়ালিতেও রথযাত্রা হত যা বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য বহন করে। ১২১৬ সালে এ জমিদার মানিকচন্দ্র মন্ডল ১৩ চূড়া বিশিষ্ট লক্ষ্মী জনার্দন-এর পুষ্পক রথ নির্মাণ করেছিলেন।

শুধু মন্দির স্থাপনই নয়, বৃন্দাবনের মত বৈষ্ণব উৎসব, কৃষ্ণ লীলা এই জমিদারির নিজস্ব উৎসবে পরিণত হয়। এই জমিদারেরা রাস মেলায় জমিদারির ছোটো ছোটো শিশুদের নিয়ে রাধাকৃষ্ণ সাজিয়ে নগর পরিক্রমা করতেন। ঝুলনও ছিল বৃন্দাবনের অনুরূপ। ফাল্গুন মাসের দোল উৎসবটি বৃন্দাবনের ফুলেদোলে তারা রূপান্তর করেছিলেন। যমুনা সাদৃশ্য বাওয়াল জমিদারির আদি গঙ্গার তীরে গোপাল জিউর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং এই ঘাট গঙ্গা গোবিন্দ ঘাট নামে আজও পরিচিত। এই জমিদারির আনাচে কানাচে বৃন্দাবন সদৃশ্য হরিনাম সংকীর্তন চলত। তাই প্রকৃত অর্থেই বাওয়াল জমিদারেরা একখন্ড বৃন্দাবন বাংলায় স্থাপন করেছিলেন।

বাংলার বহু প্রান্ত থেকে ভক্ত এবং সন্ন্যাসীরা এই জমিদারিতে আসতেন

বাংলার বহু প্রান্ত থেকে ভক্ত এবং সন্ন্যাসীরা এই জমিদারিতে আসতেন এবং গঙ্গা স্নান করে কৃষ্ণ মন্দিরে পূজা দিতেন। কথিত আছে মহাপ্রভু সম্ভবত এই জমিদারিতে এসেছিলেন। তবে বর্তমানে বাওয়ালি জমিদারের কাছারিবাড়িটি বিলাসবহুল রিসর্টে পরিণত হয়েছে, দেশ-বিদেশের শুটিং এবং ভ্রমণপ্রিয় মানুষের মনোরঞ্জনের জন্য বর্তমানে এটি টুরিস্ট স্পট হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাওয়ালীর থাকা এবং রেস্তোরাঁয় সুস্বাদু খাওয়াও এখন সহজলভ্য।  বর্তমানে এই বাওয়ালীর অধিকাংশ মন্দিরই প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। সরকার ও প্রশাসনের কাছে অনুরোধ এই ঐতিহ্যকে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করে আবারও পূর্বের একখণ্ড বৃন্দাবনকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য।।

কিভাবে পৌঁছাবেন বাওয়ালি? সবচেয়ে কম খরচে শিয়ালদহর দক্ষিণ শাখার লোকাল ট্রেনে নামতে হবে বজবজ (ভাড়া- ১০ টাকা)। এখান থেকে সরাসরি অটো বা গাড়িতে পৌঁছানো যাবে বাওয়ালি। এছাড়া ধর্মতলা থেকে SD 76 বাসে সরাসরি বাওয়ালি পৌঁছানো যাবে। আর চার চাকায় গেলে ঠাকুরপুকুর বা তারাটোলা থেকে বাখরাহাট সংযোগকারী রাস্তা ধরতে হবে। সময় লাগবে কমবেশি দুই থেকে সাড়ে দুই ঘণ্টা।

বাওয়ালি ভ্রমণের উপযুক্ত সময়, বাওয়ালি যেহেতু প্রচুর সবুজে ঘেরা তাই এই গ্রীষ্মেও ভ্রমণ করা যায়। তবে শীতকাল বাওয়ালি ভ্রমণের জন্য আদর্শ।

RELATED ARTICLES
spot_img

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

Most Popular

Recent Comments