আমরা প্রত্যেকে আজ বাইশে শ্রাবণ।
আমি সান্তিয়াগো গিয়েছিলাম
পাবলো নেরুদার মৃত্যু দেখতে। আমি
স্পেন গিয়েছিলাম লোরকার মৃত্যু দেখতে
তিনটে বুলেট তাঁর কোমরের তলা দিয়ে ঢুকে
কিভাবে বেরিয়ে এসেছিল–
কিন্তু বুলেট কিছুই করতে পারেনি কবিতার।
এখনও স্পেনের আকাশ ভরে যে জ্যোৎস্না ওঠে
তার নাম ফেদরিকো গার্সিয়া লোরকা।
আমি ঠিক এটাই বলতে চাইছিলাম
পৃথিবীর যেখানে যেখানে আজও বৃষ্টি হয়
তার নাম বাইশে শ্রাবণ।
আপনার খুব কষ্ট হচ্ছিল সেদিন
দুপুর থেকে বিকেল থেকে সন্ধ্যা থেকে
আপনার ঘনঘন হিক্কা উঠছিল
হিক্কা হিক্কা শুধু হিক্কা
যেন সভ্যতার সংকট হিক্কা হয়ে
আপনার গলা বেয়ে উঠে আসছিল নাকে মুখে।
ময়ূরের পালক পুড়িয়ে আপনাকে খাওয়ানো হল
জানি না আপনি খেয়েছিলেন কিনা
আপনি তখন খাওয়া-না-খাওয়ার ঊর্ধে
রাত তিনটের সময় আপনি চোখ মেলে তাকালেন
আপনি বারান্দায় এলেন
কোথায় দারোয়ান তার পেটে ব্যথা করছিল কাল
সে কোথায় আমি তাকে ওষুধ দেব।
বাবামশাই,আপনি ঘুমোন ,দারোয়ান ভাল আছে।
অন্ধকারের ভেতর যে আশ্চর্য আলো থাকে
সেই আলোতে বসেছিল
একটা চড়ুই,আপনি চড়ুইয়ের সামনে বসে পড়লেন
জোড়াসাঁকোর দোতলায় সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য
আপনি দুচোখ ভরে দেখছেন একটা পাখিকে
পাখিও দুচোখ ভরে দেখছে আপনাকে
আপনি বললেন ,তুই আমাকে নিতে এসেছিস?
পরের পরের দিন।মধ্যাহ্নের এক মুহূর্ত আগে।
আপনার ডান হাত উঠে গেল শূন্যে
তারপর নেমে এল নাকে তারপর চোখে
আপনার রোগা হয়ে যাওয়া দুটো আঙুল
তিরতির করে কাঁপছিল।একটা আঙুল জন্ম
একটা আঙুল মৃত্যু তারা দুজনে গাইছে:
‘তোমার কাছে এ বর মাগি মরণ হতে যেন জাগি
গানের সুরে’।
ঠিক তখনি খসে পড়ল আপনার হাত
বিছানার গা বেয়ে খসে পড়ল
ঝুলতে লাগল মেঝের একটু ওপরে।
আমি আজ বাইশে শ্রাবণ।
আমি পাবলো নেরুদার মৃত্যু দেখেছি
লোরকার মৃত্যু দেখেছি
কিন্তু কোনও কবিকে মৃত্যুদিনে জন্মাতে দেখিনি।
কয়েক কোটি মানুষ চোখের জল মুছতে মুছতে
রাজপথে নেমে এসেছিল
প্রতিটি চোখের জল গীতবিতান।
চড়ুই, তুই কাকে নিতে এসেছিলি?
পৃথিবীর যেখানে যেখানে আজও বৃষ্টি হয়
তার নাম বাইশে শ্রাবণ।




